অবচেতন মন
অবচেতন মন (Subconscious Mind) হলো আমাদের মনের সেই অংশ যা আমাদের সচেতন চিন্তা এবং অনুভূতির বাইরে কাজ করে। এটি আমাদের অভ্যাস, স্মৃতি, স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। অবচেতন মন হলো মনের গোপন ক্ষমতা, এই মনের নিয়ন্ত্রণ কৌশল জেনে সঠিক প্রয়োগ করতে পারলে আমাদের ইচ্ছা মোতাবেক অবচেতন মন ও জীবন পরিবর্তন করতে পারি, আমাদের স্বপ্ন বা কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি। অবচেতন মনের প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্য শক্তিশালী করে, ভয় দূর করে। অবচেতন মনের শক্তি ব্যবহার করে আমরা আমাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারি। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অভ্যাসগুলি গ্রহণ করে এবং ইতিবাচক চিন্তা করে আমরা আমাদের অবচেতন মনকে আমাদের পক্ষে কাজ করাতে পারি। মনোবিজ্ঞান বিদ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই অবচেতন মন।
![]() |
অবচেতন মন । Photo by pixabay.com |
অবচেতন মন সম্পর্কিত এই লেখাটি তুলনামূলকভাবে অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। অনেক কাঁটছাট করেও এরচেয়ে সংক্ষিপ্ত করতে পারলাম না। পাঠকের প্রতি অনুরোধ থাকবে লেখাটি ধৈর্য ও মনোযোগের সাথে পড়ার। অবচেতন মন সম্পর্কে জানার পূর্বে মানুষের মন সম্পর্কে কিছু ধারণা নেয়া প্রয়োজন। নিম্নে মানুষের মন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল:
মন কি?
মন মানব জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় এবং শক্তিশালী উপাদান, যা চেতন ও অবচেতন মন, এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত। চেতন মন আমাদের দৈনন্দিন সচেতন কার্যকলাপ, সিদ্ধান্ত এবং ভাবনার জন্য কাজ করে। এটি বাস্তবতাকে সরাসরি উপলব্ধি করে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়। অপরদিকে, অবচেতন মন হলো মনের গভীর স্তর, যা আমাদের অভ্যাস, অনুভূতি এবং স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। অবচেতন মনের শক্তি অত্যন্ত গভীর এবং এর প্রভাব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিদ্যমান।
"অবচেতন মনের শক্তি" শীর্ষক বইয়ে বলা হয়েছে, কিভাবে আপনার অবচেতন মন reprogram বা পুনর্গঠন করে মনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। ধ্যান, আত্মপ্রত্যয়মূলক কথা বলা এবং মনোযোগ সহকারে ইতিবাচক চিন্তা করার মাধ্যমে অবচেতন মনকে নতুন করে প্রোগ্রাম করা যায়। অবচেতন মন নিয়ে বিভিন্ন উক্তি ও পাণ্ডুলিপি আমাদের জানায় যে এটি এমন এক শক্তি, যা আমাদের জীবনের লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করতে পারে। সচেতন ও অবচেতন মন, এই দুইয়ের গুরুত্ব শুধু ব্যক্তি উন্নয়নেই নয়, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অপরিসীম। যারা অবচেতন মনের গভীরে প্রবেশ করতে চান, তাদের জন্য মনকে প্রশিক্ষিত করার উপায়গুলো অত্যন্ত কার্যকর। সচেতন এবং অবচেতন মন সমন্বয় ঘটিয়ে জীবনে সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
মন কত প্রকার ও কি কি?
মনোবিজ্ঞানী সিগমুণ্ড ফ্রয়েড মনোজগতকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:
১। চেতন মন (Conscious Mind)
২। অচেতন মন (Unconscious Mind)
৩। অবচেতন মন (Subconscious Mind)
১। চেতন মন কি?
চেতন মনে জাগ্রত অবস্থায় মানুষ পারিপার্শ্বিক জগতের সাথে সংযোগ রাখে। সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের মতে, ১০ শতাংশ চেতন অবস্থায় থাকে। আর বাকী ৯০ শতাংশই অবচেতন মন। যে মনকে আমরা ফিল করি সেটা চেতন মন। আমাদের সচেতন মন অত্যন্ত বিকশিত এবং বুদ্ধিমান। কিন্তু আসলে এর শক্তি খুবই কম আর তাতেই সমস্যা দেখা দেয়। আমরা জানি এবং বুঝি কিন্তু সেই ভুল কাজগুলোর নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। কারণ কাজ করা সম্পূর্ণরূপে অবচেতন মনের উপর নির্ভর করে। অতএব আপনি যদি অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, আপনি সহজেই সচেতন মনকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। মানুষের মনের সুখ-দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভুলে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনা, আপনি ইচ্ছানুযায়ী জীবন গঠন করা, সাফল্যের শিখরে অস্থান করা ইত্যাদি অবচেতন মনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে লাভ করা যায়।
২। অচেতন মন কি?
অচেতন মন, মাইন্ড এলগোরিদমে বা মনের পরিভাষায় তেমন একটা প্রভাব ফেলে না। অচেতন মন নিষ্ক্রিয় থাকে, যার কোনো কার্য সম্পাদনা করার সক্ষমতা নেই। আমাদের অচেতন চিন্তা এবং অনুভূতির উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই কারণ সেগুলি আমাদের সচেতন মন থেকে লুকিয়ে থাকে। এটি চিন্তা, স্মৃতি এবং সহজাত আকাঙ্ক্ষাগুলিকে ধারণ করে যা আপনার সচেতন সচেতনতার বাইরে৷ এগুলি এক প্রকার অজানা স্মৃতি তবুও আপনার আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে৷ Roger Sperry নামক একজন গবেষক আবিস্কার করেন যে মস্তিষ্কের ডান এবং বাম অংশ উভয়েরই নিজস্ব বিশেষত্ব রয়েছে। তিনি গবেষণা করে বের করেন যে মস্তিষ্কের বাম অংশ শৃঙ্খলাবদ্ধ, বিশ্লেষণধর্মী এবং যুক্তিবিদ্যা বিষয়ক চিন্তায় ব্যবহৃত হয়। অপরদিকে ডান অংশ মুক্ত, আবেগতাড়িত এবং সৃষ্টিশীল চিন্তায় সহায়তা করে। মস্তিষ্কের এই বাম অংশটিই হলো আপনার সচেতন মন এবং ডান অংশটি অবচেতন মন।
৩। অবচেতন মন কি?
মনোবিজ্ঞানে অবচেতন মন অর্থ হলো, যে চেতনা সচেতনতার সীমার মধ্যে নেই তাকে অবচেতন বলে। অবচেতন মন মানব চেতনার একটি অংশ। অবচেতন মন অভ্যন্তরীণ জগতের সাথে সংযোগ করে যেমন অতীত স্মৃতি এবং জৈবিক চাহিদা। অবচেতন মন, যদিও আমাদের সচেতন সচেতনতার বাইরে, কিছু প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের সচেতন মনে আনা যায়। উল্লেখ্য, মানসিক রোগীদের এই প্রক্রিয়ার সাহায্যে চিকিৎসা করা হয়। আমাদের আবেগ (Emotions), আচরণ (Behavior), কল্পনা (Imagination), স্বপ্ন (Dreams) ইত্যাদি অনুভূতিগুলো মূলতঃ অবচেতন মনই নিয়ন্ত্রণ করে।
অবচেতন মনের প্রভাব
অবচেতন মন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছু প্রভাবিত করে, যেমন-
১. অভ্যাস ও আচরণ
অবচেতন মনের অভ্যাস ও আচরণে গভীর প্রভাব রয়েছে। আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস এবং আচরণগুলোর অনেকটাই অবচেতনভাবে পরিচালিত হয়, যার অর্থ আমরা সেগুলিকে সচেতনভাবে না বুঝে বা চিন্তা না করেই করে থাকি। অবচেতন মনের এই প্রভাব আমাদের ব্যক্তিত্ব, জীবনধারা এবং সামগ্রিকভাবে জীবনের গুণগত মানকে গড়ে তোলে।
অভ্যাস গঠনে অবচেতন মনের প্রভাব:
অভ্যাস হলো সেই আচরণ, যা আমরা বারবার পুনরাবৃত্তি করি এবং যা অবচেতনভাবে আমাদের জীবনের অংশ হয়ে যায়। যখন আমরা কোনো একটি কাজ একাধিকবার করি, তখন সেই কাজটি আমাদের অবচেতন মনে একটি "প্যাটার্ন" বা অভ্যাস হিসেবে গেঁথে যায়। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিদিন সকালে উঠে দাঁত ব্রাশ করা, নির্দিষ্ট একটি রাস্তায় হাঁটা বা কাজ শুরুর আগে কফি খাওয়া—এগুলো সবই অভ্যাস, যা অবচেতন মনে গেঁথে যায়। অবচেতন মনের মাধ্যমে গঠিত অভ্যাসগুলো ইতিবাচক বা নেতিবাচক হতে পারে। ইতিবাচক অভ্যাসগুলো আমাদের জীবনের মান উন্নত করে এবং সফলতার পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে, যেমন- নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া বা সময়মতো কাজ সম্পন্ন করা। অন্যদিকে, নেতিবাচক অভ্যাসগুলো আমাদের জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যেমন- ধূমপান করা, দেরিতে ঘুমানো বা প্রয়োজনের বেশি চিন্তা করা।
অভ্যাস সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন।
আচরণে অবচেতন মনের প্রভাব:
আমাদের আচরণের একটি বড় অংশ অবচেতনভাবে ঘটে। আমাদের অবচেতন মন বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে তা নির্ধারণ করে এবং অনেক সময় আমরা সেই প্রতিক্রিয়াগুলো সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে পারি না। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ কোনোকালে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়, তবে সেই অভিজ্ঞতা অবচেতন মনে থেকে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভয়ের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। সুতরাং, অবচেতন মন আমাদের অভ্যাস এবং আচরণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এই প্রভাবগুলো ইতিবাচক বা নেতিবাচক হতে পারে এবং সচেতন প্রচেষ্টা ও মনোযোগের মাধ্যমে অবচেতন মনকে পুনর্গঠন করে আমাদের অভ্যাস ও আচরণকে উন্নত করা সম্ভব।
২. স্মৃতি ও তথ্য সংরক্ষণ
অবচেতন মন আমাদের স্মৃতি এবং তথ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও আমরা সচেতনভাবে আমাদের স্মৃতির কিছু অংশই মনে করতে পারি, অধিকাংশ স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা অবচেতন মনে সঞ্চিত থাকে এবং প্রয়োজনে আমাদের চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করে। আমাদের মস্তিষ্কে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ঘটনা সংরক্ষণের জন্য দুই ধরনের স্মৃতি সিস্টেম কাজ করেঃ সচেতন (Explicit) স্মৃতি এবং অবচেতন (Implicit) স্মৃতি। সচেতন স্মৃতি হলো আমরা যা সরাসরি মনে করতে পারি, যেমন- একটি ফোন নম্বর বা গতকাল কী ঘটেছিল। অবচেতন স্মৃতি হলো সেই তথ্য যা আমরা সচেতনভাবে মনে করতে পারি না, কিন্তু যা আমাদের আচরণ ও প্রতিক্রিয়া প্রভাবিত করে, যেমন- একটি শিশুর শিখে যাওয়া হাঁটা বা সাইকেল চালানোর দক্ষতা। অবচেতন মন গুরুত্বপূর্ণ বা আবেগপ্রবণ ঘটনা, অভ্যাস এবং প্যাটার্নগুলি সংরক্ষণ করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ একটি বিশেষভাবে দুঃখজনক বা আনন্দদায়ক ঘটনা অনুভব করে, তবে সেই অভিজ্ঞতা অবচেতন মনে গভীরভাবে প্রোথিত হতে পারে। পরবর্তীতে, যখন আমরা একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, তখন অবচেতন মন সেই স্মৃতিগুলিকে সক্রিয় করে এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া নির্দেশিত করে। ট্রমাটিক স্মৃতি বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা প্রায়ই অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকে এবং বিভিন্ন উপায়ে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণকে প্রভাবিত করে। যদিও আমরা সচেতনভাবে সেই স্মৃতিগুলি মনে করতে পারি না, তারা আমাদের জীবনে উদ্বেগ, ভয় বা অসুখীতা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণেই অনেক সময় মানসিক স্বাস্থ্য থেরাপি, যেমন- সাইকোথেরাপি বা হিপনোথেরাপি, অবচেতন মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই স্মৃতিগুলির সঙ্গে কাজ করে। অবচেতন মনের একটি বিশেষ গুণ হলো এটি প্রায়শই স্মৃতিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, আমরা যখন কিছু হারিয়ে ফেলি এবং সেই সময়ে সেটিকে অবচেতন মনে রাখা হয়, তখন কিছু সময় পরে বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই তথ্য আবার আমাদের সচেতন মনে ফিরে আসতে পারে। এটি ঘটে কারণ অবচেতন মনে সেই তথ্য সংরক্ষিত থাকে এবং সঠিক উদ্দীপনার মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধার হয়।
৩. আবেগ ও অনুভূতি
অবচেতন মন আমাদের আবেগ এবং অনুভূতির উপর গভীর প্রভাব ফেলে। যদিও আমরা আমাদের অনেক আবেগ এবং অনুভূতিকে সচেতনভাবে বুঝতে পারি, তাদের মূলত উত্থান এবং প্রকাশ প্রায়শই অবচেতন মনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অবচেতন মন আমাদের জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এবং বিশ্বাস থেকে প্রাপ্ত আবেগগুলিকে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবিত করে। আমাদের জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা অবচেতন মনে একটি ছাপ ফেলে। বিশেষ করে সেই অভিজ্ঞতাগুলো, যা আবেগপ্রবণ, তা অবচেতন মনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়। পরবর্তীতে, যখন আমরা কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, তখন অবচেতন মন সেই অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত আবেগগুলোকে সক্রিয় করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ শৈশবে কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তবে বড় হয়ে সেই একই ধরনের পরিস্থিতিতে তার মধ্যে একই ধরনের ভয় বা উদ্বেগের আবেগ জেগে উঠতে পারে, যদিও সে সরাসরি সেই অভিজ্ঞতাটি মনে করতে পারে না। অবচেতন মন শুধু নেতিবাচক আবেগ নয়, ইতিবাচক আবেগও ধারণ করে। যেমন, কোনো সুন্দর স্মৃতি বা সফলতার অভিজ্ঞতা অবচেতন মনে সংরক্ষিত হয় এবং ভবিষ্যতে সেই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা মনে হলে আনন্দ বা গর্বের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এই ইতিবাচক আবেগ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে সাহায্য করে।
৪. শারীরিক ক্রিয়াকলাপ
অবচেতন মনের শারীরিক ক্রিয়াকলাপগুলোর উপরও গভীর প্রভাব রয়েছে। যদিও আমরা বেশিরভাগ শারীরিক ক্রিয়াকলাপকে সচেতনভাবে পরিচালনা করি, অনেকগুলি ক্রিয়া অবচেতন মনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে। এই স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াগুলি আমাদের শরীরের কার্যকারিতা এবং জীবনের মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক শারীরিক ক্রিয়াকলাপ, যেমন- শ্বাস নেওয়া, হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ, হজম প্রক্রিয়া এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, অবচেতন মনের দ্বারা পরিচালিত হয়। আমরা এই ক্রিয়াগুলির জন্য সচেতন প্রচেষ্টা করি না; তারা স্বাভাবিকভাবেই ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা শ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়াটি সচেতনভাবে পরিচালনা করতে পারি, কিন্তু এটি মূলত অবচেতনভাবে ঘটে, এমনকি যখন আমরা ঘুমিয়ে থাকি তখনও। আবেগপ্রবণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে বা ভয়ের অনুভূতি জাগলে অবচেতন মন শরীরে শারীরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যেমন- হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, ঘাম হওয়া বা পেশী সংকোচন। এগুলো স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া, যা অবচেতন মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি। যখন আমরা কোন শারীরিক দক্ষতা অর্জন করি, যেমন- গিটার বাজানো বা ব্যাডমিন্টন খেলা, সেই দক্ষতা আমাদের অবচেতন মনে সংরক্ষিত হয়। ফলে আমরা অনেকটা চিন্তা না করেই সেই দক্ষতাগুলো ব্যবহার করতে পারি, যা আমাদের দক্ষতাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। অবচেতন মনের নেতিবাচক প্রভাবও শারীরিক অবস্থার উপর পড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস বা উদ্বেগ অবচেতন মনে সঞ্চিত হলে তা শরীরে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা বা ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হওয়া। এই ধরনের শারীরিক সমস্যাগুলি প্রায়শই মানসিক চাপ বা অবচেতন মানসিক অবস্থার প্রতিফলন হতে পারে।
৫. অবচেতন মন ও স্বপ্নের সম্পর্ক
অবচেতন মন এবং স্বপ্নের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অবচেতন মন হলো আমাদের মনের সেই অংশ, যা আমাদের সচেতন মন দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয় না। এটি আমাদের গভীর অনুভূতি, স্মৃতি এবং ইচ্ছাগুলি ধারণ করে, যা আমরা সবসময় সচেতনভাবে অনুভব করি না। স্বপ্ন হলো অবচেতন মনের প্রকাশের একটি মাধ্যম। ঘুমানোর সময়, যখন আমাদের সচেতন মন শিথিল থাকে, তখন অবচেতন মন সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন ইমেজ, অনুভূতি এবং স্মৃতি নিয়ে কাজ করতে শুরু করে। স্বপ্নগুলো সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রতিফলিত করতে পারে, যা আমরা সচেতন অবস্থায় বুঝতে পারি না বা অনুভব করি না। সিগমুন্ড ফ্রয়েড এবং কার্ল জুং এর মতো মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে স্বপ্ন অবচেতন মনের একটি সরাসরি প্রতিফলন, যা আমাদের চাপ, উদ্বেগ, ইচ্ছা এবং ভয়গুলিকে প্রকাশ করে। ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্নগুলো আমাদের অবচেতন ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষার প্রতীকী প্রকাশ। অন্যদিকে, জুং বিশ্বাস করেন যে স্বপ্নগুলো কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে না, বরং আমাদের যৌথ অবচেতন মনের গভীর স্তরগুলোও প্রকাশ করে। সুতরাং, স্বপ্ন এবং অবচেতন মনের মধ্যে একটি জটিল এবং আন্তঃসম্পর্কিত সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে স্বপ্নগুলো আমাদের অবচেতন মনকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ অনুভূতিগুলোকে উপলব্ধি করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন।
৬. অবচেতন মন ও কল্পনা
অবচেতন মন এবং কল্পনার মধ্যে একটি গভীর এবং আন্তঃসম্পর্কিত সংযোগ রয়েছে। কল্পনা হলো সেই মানসিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আমরা নতুন ধারণা, ছবি বা অনুভূতির সৃষ্টি করি। অবচেতন মন এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ এটি আমাদের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এবং অনুভূতিগুলিকে মিশ্রিত করে নতুন ধারণা বা চিত্র তৈরি করতে সাহায্য করে। অবচেতন মন আমাদের সৃজনশীলতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। যখন আমরা কল্পনা করি, তখন আমাদের অবচেতন মন থেকে বিভিন্ন তথ্য, অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতিগুলি উঠে আসে এবং নতুন কিছু তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন লেখক যখন একটি গল্প লিখতে বসেন, তার অবচেতন মন থেকে উঠে আসা বিভিন্ন চিত্র, চরিত্র এবং সংলাপ তার কল্পনাকে সমৃদ্ধ করে। কল্পনা আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এটি শুধু সৃজনশীলতার উৎস নয়, বরং সমস্যার সমাধান, লক্ষ্য স্থির করা এবং ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতেও সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন বিজ্ঞানী নতুন তত্ত্ব বা আবিষ্কারের কল্পনা করেন, যা পরবর্তীতে বাস্তবে রূপান্তরিত হয়। কল্পনার মাধ্যমে অবচেতন মন আমাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এবং নতুন সমাধান খুঁজে পেতে সাহায্য করে। সুতরাং, অবচেতন মন এবং কল্পনা একসঙ্গে আমাদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান এবং ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কল্পনা অবচেতন মনকে সক্রিয় করে এবং আমাদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা ও সমাধান আবিষ্কার করতে সাহায্য করে।
কল্পনা সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন।
৭. অবচেতন মন ও ভয়
অবচেতন মন এবং ভয়ের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ রয়েছে। অবচেতন মন হলো সেই অংশ, যা আমাদের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এবং অনুভূতিগুলোকে ধারণ করে, যদিও আমরা সেগুলো সবসময় সচেতনভাবে উপলব্ধি করি না। ভয়ও অবচেতন মনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা আমাদের নিরাপত্তা এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া প্রদান করে। ভয় সাধারণত আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ট্রমাটিক বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত হয়। অবচেতন মন এই অভিজ্ঞতাগুলোকে ধারণ করে এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তা প্রভাব ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ শৈশবে কোনো ভয়ানক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে থাকে, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা অবচেতন মনে থেকে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভয়ের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যদিও সেই ভয়ের উৎস আমরা সরাসরি বুঝতে পারি না। ভয় আমাদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা অবচেতন মনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সুতরাং, অবচেতন মন ভয়ের একটি মূল উৎস, যা আমাদের পূর্বের অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতির উপর ভিত্তি করে কাজ করে। ভয় আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, অতিরিক্ত ভয়কে অবচেতন মনের সঙ্গে কাজ করে মোকাবিলা করা যায়।
৮. অবচেতন মন ও ইচ্ছা
অবচেতন মন এবং ইচ্ছার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে অবচেতন মন আমাদের অনেক ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এই ইচ্ছাগুলি আমরা সবসময় সরাসরি উপলব্ধি করি না, তবে এগুলো আমাদের চিন্তা, আচরণ এবং সিদ্ধান্তগুলিতে গভীর প্রভাব ফেলে। আমাদের অবচেতন মনে এমন অনেক ইচ্ছা থাকে, যা আমরা সচেতনভাবে বুঝতে পারি না। এই ইচ্ছাগুলি আমাদের ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশের উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি তার জীবনের কোনো সময়ে বিশেষ কিছু অর্জনের ইচ্ছা পোষণ করতে পারে, যা তার অবচেতন মনে থেকে যায় এবং তাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। অবচেতন মন আমাদের ইচ্ছাগুলিকে প্রভাবিত করে এবং সেগুলো আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আচরণে প্রকাশিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি জীবনের একটি বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের ইচ্ছা পোষণ করতে পারে, যা তার অবচেতন মনে গভীরভাবে প্রোথিত। এই ইচ্ছা তাকে প্রেরণা যোগায় এবং সে তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা করে। সুতরাং, অবচেতন মন আমাদের ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষার একটি গভীর উৎস, যা আমাদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ইচ্ছাগুলিকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনের উন্নতির জন্য অপরিহার্য।
৯. অবচেতন মন ও সফলতা
অবচেতন মন এবং সফলতার মধ্যে একটি গভীর এবং শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। অবচেতন মন এমন একটি অংশ যা আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস, অভ্যাস এবং অনুভূতিগুলিকে গঠিত এবং প্রভাবিত করে। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলি আমাদের সফলতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবচেতন মন এমন সব বিশ্বাস এবং অভ্যাস ধারণ করে, যা আমাদের চিন্তা ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা সচেতনভাবে যা করতে চাই বা যা অর্জন করতে চাই, তার উপর আমাদের অবচেতন মন সরাসরি প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ অবচেতন মনে নিজেকে অপর্যাপ্ত বা অযোগ্য মনে করে, তবে তার চিন্তা ও আচরণে সেই অনুভূতিগুলি প্রকাশ পাবে, যা তাকে সফল হতে বাধা দেবে। আবার যদি কেউ তার অবচেতন মনে ইতিবাচক বিশ্বাস এবং অভ্যাসগুলি প্রোথিত করতে পারে, তবে তা তার সফলতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ইতিবাচক আত্মবিশ্বাস, আশা এবং ধৈর্য অবচেতন মনে গেঁথে থাকলে, এগুলি ব্যক্তিকে তার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। এমনকি কঠিন পরিস্থিতিতেও, অবচেতন মন তাকে উৎসাহিত করবে এবং নতুন সুযোগ খুঁজে বের করার প্রেরণা দেবে। সুতরাং, অবচেতন মন সফলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। অবচেতন মনকে সঠিকভাবে গঠন এবং পরিচালনা করলে তা ব্যক্তির সফলতা অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
অবচেতন মন কিভাবে কাজ করে?
অবচেতন মন আমাদের মনের একটি বিশাল অংশ যা আমাদের সচেতন চিন্তাভাবনার বাইরে থেকে কাজ করে। এটি আমাদের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, ইচ্ছা, ভয়, আবেগ এবং অনেক কিছুর আধার। কীভাবে এটি কাজ করে তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন:
- তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ: অবচেতন মন একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডারের মতো কাজ করে। এটি আমাদের জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, চিন্তা ও আবেগ সংরক্ষণ করে। সচেতন মন যা মনে রাখে না, অবচেতন মন তা সংরক্ষণ করে রাখে।
- প্যাটার্ন সনাক্তকরণ: অবচেতন মন এই সংরক্ষিত তথ্য থেকে প্যাটার্ন সনাক্ত করে এবং ভবিষ্যতে কী হতে পারে সে সম্পর্কে অনুমান করে।
- অভ্যাস ও প্রতিক্রিয়া: অবচেতন মন আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস এবং স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়াগুলি নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণস্বরূপ, গাড়ি চালানো, টাইপ করা বা হাঁটা যেমন অভ্যাসগুলো অবচেতন মনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
- বিশ্বাস ও ধারণা: আমাদের গভীরভাবে থাকা বিশ্বাস এবং ধারণাগুলি অবচেতন মনের মধ্যে থাকে। এগুলি আমাদের চিন্তা, আচরণ এবং সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ মনে করে যে তারা সফল হতে পারে না, তবে সেই বিশ্বাসটি তাদের সচেতন চিন্তায় প্রভাব ফেলবে।
- স্বপ্ন ও কল্পনা: স্বপ্ন এবং কল্পনা অবচেতন মনের একটি অংশ। এটি আমাদের মনের গভীরে থাকা ইচ্ছা, উদ্বেগ এবং চিন্তাগুলিকে প্রকাশ করে।
- শারীরিক প্রতিক্রিয়া: অবচেতন মন আমাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়াগুলি নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন- হৃদযন্ত্রের স্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, হজম এবং হরমোন নিঃসরণ।
- সময় ও পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে: অবচেতন মন সময় এবং পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে কাজ করে। এটি সময়ের কোন সীমা মানে না এবং কোনো ঘটনার সময় বা স্থান সম্পর্কে সচেতন নয়। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের অভিজ্ঞতাগুলি একসঙ্গে থাকতে পারে।
- পুনরাবৃত্তি ও প্রোগ্রামিং: অবচেতন মনের উপর পুনরাবৃত্তি এবং প্রোগ্রামিং এর মাধ্যমে প্রভাব ফেলা যায়। পজিটিভ অ্যাফার্মেশন, ভিজুয়ালাইজেশন এবং ধ্যানের মাধ্যমে আমরা আমাদের অবচেতন মনকে প্রোগ্রাম করতে পারি।
- স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং: অবচেতন মন আমাদের চারপাশের অগণিত তথ্য ফিল্টার করে এবং শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্য সচেতন মনে আনে। এটি আমাদের দৃষ্টি, শ্রবণ এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তথ্য গ্রহণ করে এবং প্রসেস করে।
- সৃজনশীলতা: অবচেতন মন সৃজনশীলতার উৎস। আমাদের অনেক সৃজনশীল ধারণা, সমস্যা সমাধান এবং উদ্ভাবনী চিন্তা অবচেতন মনের মধ্যে উৎপন্ন হয়।
এই উপাদানগুলি একসঙ্গে কাজ করে আমাদের চিন্তা, আচরণ, আবেগ এবং অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। তাছাড়াও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণেও অবচেতন মনের ভূমিকা আছে। আমরা প্রতি মুহূর্তে হাজার হাজার সিদ্ধান্ত নিই, এই সিদ্ধান্তগুলোর অনেকগুলোই অবচেতন মনের মাধ্যমে হয়। আমাদের আবেগগুলোও অবচেতন মনের প্রভাবের বাইরে নয়। অবচেতন মন নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করে আমাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায়
পৃথিবীর সব সফল মানুষই তাদের অবচেতন মন নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়া জানেন। মনের ইতিবাচক প্রভাব ও মনের শক্তির কারণেই তারা এত উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাদের কাছে অবচেতন মন ও সাফল্য একসূত্রে গাঁথা। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, অবচেতন মন সচেতন মনের চেয়ে ৩০ হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। কিন্তু অবচেতন মন কাজ করে কিভাবে বা অবচেতন মন কিভাবে ব্যবহার করবেন, এটা জানা জরুরী। যদিও অবচেতন মন সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তবে আমরা এটিকে প্রভাবিত করার জন্য কিছু কৌশল ব্যবহার করতে পারি। অবচেতন মনের কাজ ও একে ব্যবহার করার কিছু কৌশল ও পদ্ধতি নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
১. ধ্যান ও মেডিটেশন
ধ্যান বা মেডিটেশন অবচেতন মনকে শান্ত এবং নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। মেডিটেশনের মাধ্যমে আপনি আপনার মনকে স্থির করতে এবং গভীরভাবে আপনার চিন্তা ও আবেগের মধ্যে ডুব দিতে পারেন। ধ্যানের সময়, আমরা আমাদের চিন্তাভাবনাকে এক নির্দিষ্ট বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করি, যার ফলে আমাদের অবচেতন মনের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সহজ হয়। এটি অবচেতন মনের লুকানো ভাবনাগুলি চিহ্নিত করতে এবং সেগুলি নিয়ে কাজ করতে সহায়ক হয়। নিয়মিত মেডিটেশন অবচেতন মনের সাথে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে এবং প্রতিদিনের ধ্যান ও মেডিটেশন আপনাকে মানসিক শান্তি প্রদান করবে এবং আপনার মনকে স্বচ্ছ ও পরিষ্কার রাখবে।
২. আত্ম-বিশ্লেষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি
অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হলো নিজের মনোভাব, চিন্তা এবং আচরণ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা। প্রতিদিনের জীবনে কীভাবে আপনি চিন্তা করেন, কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেন এবং কেন কিছু বিশেষ অভ্যাস বা আচরণ অনুসরণ করেন, তা বোঝার চেষ্টা করুন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনি অবচেতন মনকে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শিখবেন।
৩. পরিকল্পনা এবং লক্ষ্য নির্ধারণ
আপনার জীবনের লক্ষ্যগুলি লিখে ফেলুন এবং সেগুলি পূরণের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করুন। আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করুন এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করুন।
৪. সচেতনভাবে নিজেকে উন্নত করা
আপনার দক্ষতা এবং জ্ঞান বাড়ানোর জন্য নিয়মিতভাবে পড়াশোনা করুন এবং শিখুন। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন এবং সেগুলি সমাধান করতে সচেষ্ট থাকুন।
৫. নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা
নতুন এবং ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলা আপনার অবচেতন মনকে পুনঃপ্রোগ্রাম করতে সাহায্য করবে।
৬. মানসিক চিত্র (Mental Imagery)
আপনি যা করতে চান বা হতে চান তার মানসিক চিত্র তৈরি করুন। এটি আপনার অবচেতন মনকে সেই লক্ষ্য অর্জনে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে সাহায্য করবে।
৭. স্ব-অনুমোদন এবং চিত্রকল্পন (Visualization)
অবচেতন মনকে প্রভাবিত করার একটি উপায় হলো স্ব-অনুমোদন (Self-affirmation) এবং ভিজ্যুয়ালাইজেশন (Visualization)। স্ব-অনুমোদন হচ্ছে ইতিবাচক বক্তব্য বা মন্ত্র, যা আপনি নিয়মিত নিজের কাছে বলেন, যেমন- "আমি সফল হতে পারি" বা "আমার কাজের প্রতি আমি আত্মবিশ্বাসী।" এই ধরনের বক্তব্য অবচেতন মনে ইতিবাচক বার্তা প্রেরণ করে এবং আমাদের মনকে সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করে। ভিজ্যুয়ালাইজেশন হচ্ছে আপনার লক্ষ্য অর্জনের চিত্রকে মনের মধ্যে স্পষ্টভাবে কল্পনা করা। এটি অবচেতন মনে সেই লক্ষ্যগুলিকে গভীরভাবে প্রোথিত করে এবং আপনার মস্তিষ্ককে সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রেরণা দেয়। আমরা যদি আমাদের জীবনের কোনো বিষয় সম্পর্কে কল্পনা করতে থাকি তাহলে অবচেতন মন সেটিকে ধরে ফেলে এবং আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। তাই আপনি কি হতে চান বা করতে চান তা কল্পনা করতে হবে। তবে অবশ্যই দৃশ্যায়নের ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে কল্পনা করতে হবে। অযথা, অবান্তর, অবাস্তবসম্মত বা বিভ্রান্তিকর কোন কিছু কল্পনা করা যাবেনা। অন্যের কোন ক্ষতি কল্পনা করা যাবেনা, কোনরকম নেগেটিভ মনোভাব প্রকাশ করা যাবেনা। সহজ কথায় পজিটিভ কল্পনাটাকে একটি যৌক্তিক পদ্ধতিতে সংগঠিত করে সাজিয়ে গুছিয়ে অবচেতন মনে ইনপুট করতে হবে।
৮. পুনরাবৃত্তি (Repetition)
পুনরাবৃত্তি অবচেতন মনকে প্রভাবিত করার একটি কার্যকর পদ্ধতি। একটি নির্দিষ্ট চিন্তা, বিশ্বাস বা অভ্যাস বারবার পুনরাবৃত্তি করলে তা অবচেতন মনে গেঁথে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি নতুন কোনো অভ্যাস তৈরি করতে চান, তবে সেই অভ্যাসটি নিয়মিতভাবে পালন করুন যতক্ষণ না তা আপনার অবচেতন মনের অংশ হয়ে যায়।
৯. স্বপ্নের বিশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণ
স্বপ্ন হলো অবচেতন মনের একটি প্রাকৃতিক প্রকাশ। স্বপ্নের মাধ্যমে আপনি অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা চিন্তা ও আবেগগুলিকে বুঝতে পারেন। স্বপ্নের বিশ্লেষণ করে আপনি নিজের মনকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন এবং সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন। প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে যতটা সম্ভব ইন্দ্রিয় নিষ্ক্রিয় করুন। ঘর অন্ধকার করুন, আপনার চোখ বন্ধ করুন, আপনার কান ঢেকে রাখুন, আপনার জিহ্বা আপনার মুখের তালু স্পর্শ করে রাখুন, শুয়ে থাকুন এবং দশ মিনিটের জন্য আপনার ধারণাটি কল্পনা করুন বা ধারণাটি নিয়ে ভাবতে যতক্ষণ লাগে। আপনার সংগঠিত কল্পনার শুরু থেকে ভবিষ্যতে কল্পনার সীমা দিকে চিন্তার গতি প্রবাহিত করুন। এভাবে কয়েকদিন নিয়মিত চিন্তা করলে অবচেতন মনে কল্পনা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। আপনার মনে এই অনুভূতি হবে যে আপনার কল্পনা সত্যি হয়েছে তা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এখন অবচেতন মন তার জাদুকরী শক্তি দিয়ে আপনার স্বপ্নপূরণের পরিস্থিতি তৈরি করবে।
১০. ধৈর্য এবং ধারাবাহিকতা
অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সময় এবং ধৈর্য প্রয়োজন। নিয়মিত এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আপনাকে ধীরে ধীরে আপনার অবচেতন মনকে প্রভাবিত করতে এবং আপনার জীবনকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে।
১১. ইতিবাচক চিন্তা অনুশীলন ও পরিবেশ সৃষ্টি
ইতিবাচক মনোভাব এবং চিন্তা অবচেতন মনের ওপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। প্রতিদিন ইতিবাচক চিন্তা করা, স্ব-অনুমোদন বা affirmation ব্যবহার করা এবং নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া অবচেতন মনে একটি ইতিবাচক প্যাটার্ন তৈরি করতে সাহায্য করে। ইতিবাচক আউটপুট পেতে আপনার অবচেতন মনকে সর্বদা ইতিবাচক ইনপুট দেওয়া উচিত। কারণ আমাদের অবচেতন মন একটি যন্ত্রের মতো কাজ করে। এর কাজ হলো ইনপুট নেওয়া এবং এটি প্রক্রিয়া করা এবং সচেতন মনকে আউটপুট দেওয়া। অতএব, আপনি যত বেশি ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করবেন, তত বেশি আপনার অবচেতন মন আপনার শরীরকে নির্দেশ করবে এবং পরিস্থিতি তৈরি করবে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিদিন সকালে ও রাতে আপনি নিজেকে বলতে পারেন, "আমি সফলতা অর্জন করতে পারি" বা "আমার জীবনে ভালো কিছু ঘটবে বা "আমি সফল হবো" বা "আমার জীবন সুখী ও সমৃদ্ধ।" তাই সবসময় ইতিবাচক চিন্তা (Positive Thinking) করুন।
১২. নেতিবাচক চিন্তা নিয়ন্ত্রণ
যে কোন কাজে আমরা অনেক চিন্তা করি। তাদের বেশিরভাগই সেই কাজের সাফল্য সম্পর্কে নিশ্চিত নন। এরকম অনেক নেতিবাচক চিন্তা “আমাকে দেওয়া হবে না”, “আমি দিতে পারব না”, “আমি করতে পারবোনা”, “কাজটি খুব কঠিন” ইত্যাদি আমাদের চিন্তায় ঘুরতে থাকে। যদিও আমাদের স্বাভাবিক বা সচেতন মন এই অগণিত চিন্তাগুলিকে ধারণ করে, কিন্তু অবচেতন মন সেগুলিকে এমনভাবে ধারণ করে যে আমরা সেগুলি থেকে বের হতে পারি না। ফলাফল হিসেবে নেগেটিভ চিন্তাগুলোই মনে স্থায়ী হয়। যার ফলে ঐ কাজগুলি আমরা সত্যিই করতে পারিনা। তাই নেতিবাচক চিন্তা (Negative Thinking) থেকে দূরে থাকুন।
১৩. দুঃখিত স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ
আপনার মন নিয়ন্ত্রণ করতে আপনাকে বিভ্রান্ত করছে এমন চিন্তাগুলি চিহ্নিত করুন। যদি মনের মধ্যে বারবার কষ্টকর চিন্তা আসে, কোন কারণ ছাড়াই মন অস্থির হয়ে ওঠে, তাই আগে চিন্তার উৎস খুঁজে বের করুন। তারপর চিন্তা পুরোপুরি বন্ধ করুন। ইতিবাচক চিন্তা শুরু করুন। আপনার জীবনের ইতিবাচক দিকগুলি সম্পর্কে চিন্তা করুন। আপনি ইতিবাচক জিনিসগুলির একটি তালিকাও তৈরি করতে পারেন। যখন আপনার মনে নেতিবাচক চিন্তা আসে, তখন ইতিবাচক চিন্তার তালিকাটি দেখুন বা চিন্তা করুন। একটি তিক্ত অতীত অভিজ্ঞতার স্মৃতিকে মনোরম চিন্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন করুন। নেতিবাচক চিন্তা মনে এলে কিছু সময় অতি দ্রুত চোখের পলক ফেলুন এবং পলক ফেলার মাঝেই ইতিবাচক চিন্তা মনে প্রবেশ করিয়ে দিন। ইতিবাচক চিন্তা মনে সেট হয়ে গেলে পলক ফেলা বন্ধ করুন। পলক ফেলার সাথে মাইন্ড কন্ট্রোলের সহ অনেক বিষয়ের সংযোগ আছে, পরবর্তিতে এই বিষয়ে আলোচনা করবো।
১৪. ভুলে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনা
ভুলে যাওয়া স্মৃতির উৎস বা যেগুলো ভুলে গেছেন তার কোন পটভূমি খুঁজে বের করুন। যদি সম্ভব হয় কারে মাধ্যমে বা যেকোন উপায়ে জানার চেষ্টা করুন ভুলে যাওয়া স্মৃতির ঘটনাবলী এবং মূল ঘটনাগুলির পিনপয়েন্ট করুন। এবার ঘটনাগুলো সাজান এবং এমন একটা পটভূমি তৈরি করুন যে আপনি স্মৃতি ফিরে পেয়েছেন এখন ঘটনাগুলোর কেমন প্রভাব আপনার জীবনে আসতে পারে সেটা নিয়ে পজিটিভ কল্পনা করুন। কল্পনাটা যেন ভুলে যাওয়া ঘটনার সাথে সম্পর্কিত হয় অবশ্যই পজিটিভ কল্পনা করবেন। কারো মাধ্যমে আপনার ভুলে যাওয়া প্রাপ্ত তথ্যের সাথে আপনার নতুন পজিটিভ ভাবনা যুক্ত করে এবার ঘুমের আগে দশ মিনিটের পদ্ধতির মাধ্যমে অবচেতন মনে ইনপুট দিন। আরো সহজে বললে- আপনি অলরেডি ভুলে গেছেন সেই ঘটনা আপনার কল্পনায় এনে সেটাকে সত্য হিসেবে ধরে নিয়ে ঘটনার পরের অংশ পজিটিভলি কল্পনায় যোগ করবেন নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত। এই কল্পনার সীমাটা হোক আপনার জীবনের নতুন লক্ষ। আশা করা যায় অবচেতন মনে আপনাকে সাহায্য করবে স্মৃতি ফিরিয়ে আনার।
১৫. স্ব-অনুমোদন (Self-Hypnosis)
স্ব-অনুমোদন (Self-Hypnosis) হলো একটি আত্ম-নিয়ন্ত্রিত হিপনোসিস পদ্ধতি, যেখানে আপনি নিজেই অবচেতন মনকে প্রভাবিত করার জন্য একটি শিথিল এবং মনোযোগপূর্ণ অবস্থায় চলে যান। এটি মূলত মনের গভীরে জমে থাকা নেতিবাচক চিন্তা বা অভ্যাস পরিবর্তন করতে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং স্ট্রেস কমাতে ব্যবহৃত হয়। স্ব-অনুমোদন এমন একটি বিষয়, যে বিষয় নিয়ে আলাদা করে একটি প্রবন্ধ লেখা যাবে। আমি সংক্ষিপ্তকারে চেষ্টা করছি-
স্ব-অনুমোদনের পদ্ধতি
- শিথিল হওয়া: প্রথমে একটি আরামদায়ক অবস্থানে বসুন বা শুয়ে পড়ুন। নিশ্চিত করুন যে আপনি কোন ধরনের বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত। চোখ বন্ধ করুন এবং ধীরে ধীরে শরীরের প্রতিটি অংশ শিথিল করুন। শ্বাস-প্রশ্বাসকে গভীর করুন এবং প্রতিটি শ্বাস গ্রহণের সাথে সাথে আপনার শরীর এবং মনকে শিথিল করতে দিন।
- মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা: একটি নির্দিষ্ট শব্দ, ছবি বা অনুভূতির উপর আপনার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করুন। এটি একটি শান্ত সমুদ্রের দৃশ্য, একটি প্রিয় স্থান বা একটি শান্তিপূর্ণ শব্দ হতে পারে। এই নির্দিষ্ট চিন্তা বা ইমেজের উপর আপনার পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ করুন।
- ইতিবাচক বার্তা (Affirmation) প্রেরণ: এখন, আপনি যা পরিবর্তন বা অর্জন করতে চান, সেই বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা (Affirmation) তৈরি করুন। উদাহরণস্বরূপ: স্বাস্থ্য: "আমার শরীর সুস্থ এবং শক্তিশালী।", আত্মবিশ্বাস: "আমি আত্মবিশ্বাসী এবং সক্ষম।" অভ্যাস: "আমি ধূমপান ছেড়ে দিতে পারি।" তাছাড়া সফলতা বা সামাজিক সম্পর্কের বার্তাগুলো বারবার নিজেকে বলুন এবং সেগুলো যেন আপনার অবচেতন মনে গভীরভাবে প্রবেশ করে।
- দৃশ্যায়ন (Visualization): আপনার লক্ষ্য বা ইচ্ছাগুলি কল্পনা করুন, যেন সেগুলো ইতিমধ্যে আপনার জীবনে বাস্তবায়িত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি সফল হতে চান, তাহলে সেই সফল মুহূর্তটি কল্পনা করুন, যেন আপনি সেই মুহূর্তটি এখনই উপভোগ করছেন।
- চেতনায় ফিরে আসা: কিছু সময় পরে, ধীরে ধীরে নিজেকে চেতনায় ফিরিয়ে আনুন। ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসুন এবং আস্তে আস্তে চোখ খুলুন। এখন আপনি আবার চেতনায় ফিরে এসেছেন এবং স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যেতে পারেন।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে স্ব-অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি অনুশীলন করুন। এটি আপনার মনের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একটি শান্ত এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুশীলন করুন, যেখানে কম আলো এবং কম শব্দ রয়েছে। দিনের সেই সময় বেছে নিন যখন আপনি সবচেয়ে শান্ত এবং মনোযোগী হতে পারেন, যেমন- সকালে বা রাতে। স্ব-অনুমোদন আপনার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে এবং মনের গভীরে জমে থাকা চিন্তা বা আবেগগুলিকে প্রভাবিত করতে একটি কার্যকরী হাতিয়ার হতে পারে। এটি আপনাকে আপনার লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করতে পারে এবং আপনার মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। পরবর্তি কোন লেখায় স্ব-অনুমোদন (Self-hypnosis) সম্পর্কে বিস্তারিত লিখবো।
১৬. এনএলপি (Neuro-Linguistic Programming)
নিউরো-লিঙ্গুইস্টিক প্রোগ্রামিং (Neuro-Linguistic Programming বা NLP) হলো একটি ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং থেরাপির পদ্ধতি, যা মানুষের চিন্তা, ভাষা এবং আচরণের মধ্যে সম্পর্ককে বোঝার ও প্রভাবিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত ১৯৭০-এর দশকে রিচার্ড ব্যান্ডলার (Richard Bandler) এবং জন গ্রাইন্ডার (John Grinder) দ্বারা প্রবর্তিত হয়। এটি একটি শক্তিশালী কৌশল যা অবচেতন মনকে প্রোগ্রাম করতে ব্যবহৃত হয়। এটির মাধ্যমে আপনি আপনার ভয়কে কাটিয়ে উঠতে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। পরবর্তি কোন লেখায় এনএলপি (Neuro-Linguistic Programming) সম্পর্কে বিস্তারিত লিখবো।
১৭. হিপনোথেরাপি (Hypnotherapy)
হিপনোথেরাপি (Hypnotherapy) হলো একটি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যা হিপনোসিস বা গভীর শিথিলতার মাধ্যমে মানুষের অবচেতন মনে কাজ করে। এই পদ্ধতিটি বিভিন্ন মানসিক ও শারীরিক সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে সম্মোহনের অবস্থা ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন মানসিক এবং আচরণগত সমস্যা, যেমন- উদ্বেগ, ডিপ্রেশন, ধূমপান ত্যাগ করা, ওজন কমানো, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য। হিপনোথেরাপি সাধারণত নিরাপদ, তবে এটি সম্পাদন করার জন্য একজন প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ থেরাপিস্টের কাছে যাওয়া উচিত। ভুলভাবে পরিচালিত হিপনোথেরাপি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পরবর্তি কোন লেখায় হিপনোথেরাপি সম্পর্কে বিস্তারিত লিখবো।
১৮. সাইকোথেরাপি (Psychotherapy)
সাইকোথেরাপি (Psychotherapy) হলো মানসিক সমস্যা, আবেগজনিত অসুবিধা এবং আচরণগত সমস্যাগুলির চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত একটি মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি। এটি "টক থেরাপি" নামেও পরিচিত, কারণ এটি মূলত কথোপকথনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সাইকোথেরাপির মাধ্যমে রোগী তার অনুভূতি, চিন্তা এবং আচরণের প্যাটার্নগুলি বিশ্লেষণ করে এবং সেগুলি পরিবর্তনের চেষ্টা করে। সাইকোথেরাপির বিভিন্ন ধরণ রয়েছে এবং নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য নির্দিষ্ট ধরণগুলি ব্যবহার করা হয়, যেমনঃ উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং বিভিন্ন মানসিক অসুবিধায় “কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT)”; বিষণ্ণতা এবং সীমান্তরেখা ব্যক্তিত্ব ব্যাধি (Borderline Personality Disorder) চিকিৎসায় “ডায়ালেক্টিকাল বিহেভিয়ার থেরাপি (DBT)”; পুরানো অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির প্রভাব বিশ্লেষণ, ব্যক্তির নিজস্ব সক্ষমতা এবং আত্ম-অর্জনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে “সাইকোডায়নামিক থেরাপি (Psychodynamic Therapy)”; বিবাহ, বন্ধুত্ব বা পারিবারিক সম্পর্কের সমস্যা সমাধানে “ইন্টারপারসোনাল থেরাপি (IPT)” ইত্যাদি। সাইকোথেরাপি শুরু করার আগে, একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং কোন ধরনের থেরাপি আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত তা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তি কোন লেখায় সাইকোথেরাপির বিভিন্ন ধরণ আলাদাভাবে বিস্তারিত লিখবো।
উপসংহার
অবচেতন মন আমাদের জীবনের এক অপরিসীম শক্তির উৎস, যা আমরা সচেতনভাবে উপলব্ধি করি না। এই শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে, আমরা আমাদের চিন্তা, অভ্যাস এবং জীবনের গতি পরিবর্তন করতে পারি। আপনার অবচেতন মনকে ইতিবাচক ধারণা এবং প্রেরণাদায়ক বার্তায় পূর্ণ করুন। প্রতিদিন ইতিবাচক অভ্যাস চর্চা এবং ধ্যানের মাধ্যমে আপনার অভ্যন্তরীণ শক্তিকে সক্রিয় করুন। আপনার মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা সীমাহীন সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের দিকে এগিয়ে যান। মনে রাখবেন, আপনি যা ভাববেন, আপনার অবচেতন মন সেই অনুযায়ী বাস্তবতা তৈরি করবে।
আপনার জীবনে সুখ, শান্তি ও সাফল্য অর্জন করতে অবচেতন মনের শক্তি ব্যবহারের এই পথটি অনুসরণ করুন। এটি শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির চাবিকাঠি নয়, বরং একটি পরিপূর্ণ ও অর্থবহ জীবনের মূলমন্ত্র। তাই আজ থেকেই আপনার অবচেতন মনের সঙ্গে কাজ করা শুরু করুন এবং এর অফুরন্ত সম্ভাবনাকে নিজের জন্য কাজে লাগান। আপনার মনের শক্তি ও অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের উপর আস্থা রাখুন, কারণ তা-ই আপনাকে জীবনের যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করবে। একটি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলুন, এবং অবচেতন মনের অসীম শক্তি দিয়ে আপনার স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়িত করুন।
হিউম্যান সাইকোলজিতে অবচেতন মনের গুরুত্ব ও অবচেতন মনের প্রভাব (Impact of the Subconscious Mind) সবচেয়ে বেশি অথচ আমরা অবচেতন মন সম্পর্কে তেমন কোন ধারনাই রাখিনা। প্রতিটি মানুষের জীবনে এর গুরুত্ব অনেক। অবচেতন মনের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারেন। তবে আমি কোন মনোবিজ্ঞানী বা মনোবিশেষজ্ঞ নই তাই অবচেতন মনের মতো বিষয়ে আমার জ্ঞান অতি সীমিত। অবচেতন মন সম্পর্কে এই লেখা আমার ব্যক্তিগত। এই লেখায় বিভিন্ন ব্লগ, পোস্ট, ভিডিও, বই, ইবুক, জার্নালের মাধ্যমে জেনে, বুঝে এবং বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টের অভীজ্ঞতার আলোকে লেখার চেষ্টা করেছি। তবুও অবচেতন মন নিয়ে আমার জ্ঞান একজন শিক্ষানবিশের মতই। তাই অবচেতন সম্পর্কিত আমার লেখা, এক্সপেরিমেন্ট পদ্ধতি ও ফলাফল শুধুই আমার ব্যক্তিগত। যে কেউ এই নিবন্ধে উল্লেখিত পদ্ধতি ও ফলাফলের ভিত্তিতে নিজে নিজে প্রয়োগ করলে এর দায় আমার নয়। আমার পরামর্শ থাকবে অবশ্যই কোন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়ে অবচেতন মন জাগ্রত করার উপায়গুলো ব্যবহার করবেন। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এর প্রয়োগ করতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কেউ প্রয়োগ করলে নিজ দায়ীত্বে করবেন। অবচেতন মনের কার্যকলাপ, নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও উপকারিতা ডিটেইলস আকারে জানতে চাইলে বিভিন্ন বই, ব্লগ, জার্নাল স্টাডি করতে পারেন।
Feriwala এর সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।
0 Comments